‘বাবা তুমি কি চাও তোমার সিগারেটের কারণে আমি মারা যাই’

‘বাবা তুমি কি চাও তোমার সিগারেটের কারণে আমি মারা যাই’
অভিনেতা আবুল হায়াতসহ আরও অনেকে তামাকবিরোধী সভায় - সংগৃহীত ছবি

তামাক নিয়ন্ত্রণে আইনের পাশাপাশি কাজে লাগাতে হবে মানুষের আবেগকেও। এক্ষেত্রে পরিবার সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। তামাক গ্রহণে উদ্বুদ্ধ না করে, শপথ নিতে হবে তামাক থেকে দূরে থাকার। সরকারকে তামাক থেকে করের কথা না ভেবে এতে স্বাস্থ্য খাতে যে ব্যয় বেড়েছে সেটা ভেবে আইন করতে হবে।

আজ বুধবার (৩০ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলামটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে ‘তামাকবিরোধী সমসাময়িক আন্দোলন ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা হয়। এতে অভিনেতা, সংসদ সদস্য ও চিকিৎসকসহ উপস্থিত ছিলেন আরও অনেকে।

অভিনেতা আবুল হায়াত তার বক্তব্যে বলেন, তামাকটা মূলত দেখে শুরু হয়। এটা কীভাবে বন্ধ করবো। আইন করে যদি বন্ধ না হয় তবে এটা বন্ধ করতে আরেকটি পথ আছে সেটি হলো ইমোশন। ইমোশন দিয়ে তাদের ফেরাতে হবে। আমাকে এই কাজটা করেছিল আমার মেয়ে। একদিন আমার মেয়ে বললো, ‘বাবা তুমি কি চাও তোমার সিগারেটের কারণে আমি মারা যাই?’ সেদিনের পর থেকে একবারের জন্যও আর সিগারেট হাতে নেইনি। এরপর ১০০টি নাটক পরিচালনা করেছি সেখানের একটিতেও সিগারেটের কোনো শর্ট নেই। মিডিয়াতে ই-সিগারেট একটা ট্রেন্ড হয়ে গেছে। যে যত বড় তারকা সে তত এটা খায়। এখানেও আইন থাকা উচিত।

তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর প্রশংসা করে তিনি বলেন, যারা সিগারেট পান করে সমাজে তাদের মানুষ ভালো চোখে দেখে না। এটা বিভিন্ন সংগঠনের কারণেই হয়েছে।

রাজশাহী-২ আসেন সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, তামাকবিরোধী একটি নতুন আইন আসছে। এটা যেন পাস করে দেয় সেটাই আশা করি। কোনো বিতর্ক ছাড়াই যেন বিলটি পাস হয়ে যায়, এ জন্য যত ধরনের সহযোগিতা করা যায় তা আমরা সবাই যেন করি।

তিনি বলেন, আমাকে একবার এক চিকিৎসক বললেন তুমি সিগারেট না ছাড়লে চিকিৎসা করাবো না। আমার পকেটে তখন একটা সিগারেট। আমি সেটা বাইরে গিয়ে খেয়ে শপথ নিলাম আর কোনোদিন সিগারেট খাবো না। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত আর সিগারেট খাইনি।

সাবেক ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন চুন্নু বলেন, তামাক থেকে বিরত থাকতে হবে। শরীরকে সুস্থ রাখতে হলে এটা জরুরি। আইন করে তদারকি করতে হবে। তা না করলে বাস্তবায়ন হবে না।

‘নিরাপদ সড়ক চাই’র প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, তামাক আইন দিয়ে বন্ধ করা যাবে না এটা ঠিক নয়। কারণ আইন মানুষকে সুশৃঙ্খল করে।

তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনের কোনো কেন্দ্রে যেন তামাক ব্যবহার বা উৎসাহিত করা না হয় সেই বিষয়টা নিশ্চিত করা উচিত। যদি কেউ করে তবে আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হয়। পরিবার যেমন বাবা-মা পরিচালনা করে, তেমনি সমাজ-রাষ্ট্রও যারা পরিচালনা করে তাদেরকেও ঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে।

ইব্রাহিম কার্ডিয়াক কলেজের অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ৪০ বছর যাবত তামাকবিরোধী আন্দোলন করছি। তামাকের ক্ষতিকর দিক কে না জানে। কিন্তু সমস্যা হলো তামাক কোম্পানিদের উৎপাদন বন্ধ করতে পারছি না। সরকার তা করতে পারছে না, তারা এতটাই শক্তিশালী। বিষয়টি হলো সর্ষের ভেতরে ভূত থাকলে তো আর কিছু করার নেই। করোনার জন্য আমরা কত সচেতন ছিলাম, এতে যে পরিমাণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ মারা যায় তামাকে। নতুন করে ই-সিগারেট চালু হয়েছে। এটাও ক্ষতিকর, যা বিশ্বের ১১৬টি দেশে এরইমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে।

পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম শাহজাদা বলেন, সরকার অনেক ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট করেছে। মনোনয়নের ক্ষেত্রেও ডোপ টেস্ট করা দরকার। আইনে এগুলোও যুক্ত করা দরকার। সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু আইন করে নয়, সামাজিক কাঠামোতেও নজর দিতে হবে। নিজের সন্তান তামাক গ্রহণ করছে কি না তা বাবা-মাকেই দেখা উচিত।

বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন তামাকের সংস্কৃতির কথা তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য বলেন, তামাক দিয়েই ভোট চাওয়া হয়। নির্বাচনে একজনকে সিগারেট না দিলে বরং অখুশি হয়। অথচ হওয়া উচিত তার উল্টোটা।

সাংবাদিক সুশান্ত কে. সিনহা বলেন, ঢাকায় রিকশাচালকদের যদি লাইসেন্স নিতে হয় তাহলে একজন বিড়ি-সিগারেট বিক্রির দোকানদারকে কেন লাইসেন্স নিতে হবে না।

উন্নয়ন সমন্বয়ের সভাপতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান সভায় সভাপতিত্ব করেন।